বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই বলছেন—“পৃথিবী জ্বলে উঠছে!” শুনতে সিনেমার ডায়লগ মনে হলেও, এটি নিছক ভয় দেখানো নয়, বরং আমাদের নিজেদের কৃতকর্মের ফল। নির্বিচারে গাছ কাটা, গাড়ির ধোঁয়া, কলকারখানার কালো ধোঁয়া, অফিস–বাড়ির এসির ঠান্ডা বিলাস—সব মিলে পৃথিবীর মাথায় আগুন ধরিয়েছে। কার্বন ডাই–অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ওজোন—এই ‘গ্রিনহাউস গ্যাস গ্যাং’ একসঙ্গে মিলে আমাদের প্রিয় নীল গ্রহটাকে ধীরে ধীরে লাল করে তুলছে।
বরফ গলছে, পানি বাড়ছে—আমরা তলাচ্ছি
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রভাব দেখা যাচ্ছে হিমবাহে। বরফ গলছে দ্রুত, সমুদ্র ফুলছে, আর তাতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কাঁপছে উপকূলীয় দেশগুলো। বাংলাদেশ, যার ভৌগোলিক অবস্থাই ঝুঁকিপূর্ণ, এখন যেন দুর্যোগের ‘হটস্পট’। তাপদাহ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, বজ্রপাত, নদীভাঙন—সবই বেড়ে গেছে, আর প্রকৃতি যেন রীতিমতো প্রতিশোধ নিচ্ছে।
গরমে ঘাম ঝরছে, গায়ে আগুন লাগছে
এপ্রিল থেকে জুন—আগে ছিল গ্রীষ্মকাল, এখন যেন “হিট সিজন”। তাপমাত্রা বেড়েছে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর তার সঙ্গে বেড়েছে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, পেশির টান, এমনকি মৃত্যুও। সমাধান? রোদে না বের হওয়া, ছাতা ধরা, প্রচুর পানি খাওয়া, আর কারও অজ্ঞান দেখলে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া—অবহেলা নয়, এখন এটা জীবন রক্ষার কৌশল।
দূষিত বাতাসে ফুসফুসের আর্তনাদ
ঢাকায় নিশ্বাস নেওয়া এখন যেন এক রকম ‘ফুসফুস এক্সারসাইজ’। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সিসা, দস্তা, সালফার আর সিএফসি—একটি ককটেল মিশ্রণ যা শ্বাসনালিকে ক্ষতবিক্ষত করছে। ফুসফুসের রোগ যেমন অ্যাজমা, সিওপিডি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র। হাসপাতাল ভর্তি হচ্ছে ফুসফুসের রোগীদের ভিড়ে।
মশা–পাখিরা এখন ভাইরাস বাহক!
আবহাওয়া বদলেছে, তার সঙ্গে বদলেছে মশা–পাখিদের আচরণও। গরমে সুপ্ত ভাইরাসগুলো জেগে উঠছে, ছড়াচ্ছে নতুন নতুন রোগ। বিশ্বের নানা প্রান্তে দেখা দিচ্ছে লাইম ডিজিজ, ওয়েস্ট নেইল ভাইরাস—আগে নামও শোনা যেত না। মনে হচ্ছে, রোগেরাও যেন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘ইভলভ’ করছে।
পানিবাহিত রোগের প্লাবন
অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর ঝড় মিলে দূষিত করছে স্বাদুপানির উৎস। ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগ এখন প্রতিনিয়তই কারও না কারও দরজায় কড়া নাড়ছে।
মনও কি শান্ত থাকতে পারে?
দুর্যোগ শুধু গাছ বা বাড়িঘর ভাঙে না, মনও ভাঙে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষ হারায় প্রিয়জন, সম্পদ, নিরাপত্তাবোধ। উদ্বেগ, হতাশা, মানসিক অস্থিরতা—সবই এখন জলবায়ুর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
পেটের লড়াই: খাদ্যনিরাপত্তার হুমকি
খরা, অতিবন্যা, উপকূলের লবণাক্ততা—সব মিলিয়ে কৃষকের ফসলের মাঠে এখন বিষাদের ছায়া। কমছে উৎপাদন, বাড়ছে খাদ্যঘাটতি ও অপুষ্টি। তার সঙ্গে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার–কীটনাশকের ব্যবহার খাবারে মিশে বাড়াচ্ছে ক্যানসারের ঝুঁকি। খাদ্যনিরাপত্তা এখন আর ভবিষ্যতের সমস্যা নয়, এটি বর্তমানের আতঙ্ক।
কারা বেশি বিপদে?
সবাই সমানভাবে ঝুঁকিতে নয়। সবচেয়ে বিপদে—
-
ছোট শিশু ও বয়স্করা
-
গর্ভবতী নারীরা
-
যাদের অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে
-
যারা রোদে কাজ করেন—শ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালক, ট্রাফিক পুলিশ
এখনই সময় একসঙ্গে এগিয়ে আসার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যালায়েন্সসহ অনেক সংস্থা ইতিমধ্যে সচেতনতায় কাজ করছে। কিন্তু শুধু তাদের নয়, আমাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। কমাতে হবে জ্বালানির ব্যবহার, বন্ধ করতে হবে বৃক্ষনিধন, আর লাগাতে হবে আরও বেশি গাছ। সবুজ পৃথিবীই আমাদের ঠান্ডা পৃথিবী।
শেষ কথা:
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কোনো দূরের হুমকি নয়—এটি এখন দরজায় দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ছে। যদি এখনই সচেতন না হই, তবে পরের প্রজন্মকে আমরা হয়তো একটি “গরম পৃথিবীর গল্প” নয়, বরং “গরম পৃথিবীর কষ্ট” উপহার দেব।
