ওসমান হাদি – নামটা শুনলেই মনে পড়ে যায় একটা ঝড়ের মতো জীবন, যেখানে রাজনীতি, সাহস এবং একটু হাস্যরস মিশে গেছে। ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন জন্ম নেওয়া এই যুবক ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর গল্পটা এখনও বাংলাদেশের রাস্তায়-ঘাটে, চায়ের দোকানে আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়ায়। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত হাদি ছিলেন একজন রাজনৈতিক কর্মী, বক্তা এবং স্বপ্নদর্শী, যিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর জীবন যেন একটা কমেডি-ড্রামা সিনেমা: কখনো হাসি, কখনো লড়াই, আর শেষে একটা অসমাপ্ত গল্প যা আমাদের সবাইকে ভাবিয়ে তোলে – ওসমান হাদি না থেকেও বেশি করে থাকবেন বাংলাদেশের বুকে।
প্রাথমিক জীবন: মাদ্রাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ
ওসমান হাদির গল্প শুরু হয় ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায়, একটা সাধারণ মুসলিম পরিবারে। বাবা ছিলেন মাদ্রাসার শিক্ষক আর স্থানীয় ইমাম – যেন একটা ক্লাসিক বাংলা সিনেমার সেটিং। ছয় ভাই-বোনের সবচেয়ে ছোট হাদি শুরু করেন নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায়, কিন্তু তৃতীয় শ্রেণি শেষ করে চলে যান ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসায়। সেখান থেকে আলিম পরীক্ষা দিয়ে সোজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। হাস্যকরভাবে বলতে গেলে, মাদ্রাসা থেকে ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া যেন একটা 'লেভেল আপ' গেম – কিন্তু হাদির ক্ষেত্রে এটা ছিল স্বপ্নের শুরু।
পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ইংরেজি শেখানোর প্রাইভেট ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করতেন, আর শেষের দিকে ইউনিভার্সিটি অব স্কলারসে। কল্পনা করুন, একদিকে রাজনীতির ঝড়, অন্যদিকে ক্লাসরুমে শিক্ষা – হাদি যেন একটা মাল্টিটাস্কিং সুপারহিরো। তাঁর এই পটভূমি দেখিয়ে দেয়, কীভাবে সাধারণ শিকড় থেকে উঠে এসে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন।
রাজনৈতিক যাত্রা: রামপুরা থেকে জাতীয় মঞ্চে
ঢাকার রামপুরায় বাসা নেওয়ার পর হাদির জীবন নেয় একটা টার্ন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তিনি স্থানীয় সমন্বয়ক হিসেবে জড়িয়ে পড়েন, যেন একটা লোকাল হিরো যিনি রাস্তায় নেমে লড়াই করছেন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে তাঁকে দেখা যায় তরুণ নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় একজন হিসেবে। হাসির কথা, এই আন্দোলনগুলোতে তিনি যেন বলছিলেন, "রাজনীতি শুধু মাইক ধরে কথা বলা নয়, এটা জনগণের সাথে হাত মিলিয়ে চলা।"
ইনকিলাব মঞ্চ: বিপ্লবের নতুন মুখ
জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত ইনকিলাব মঞ্চ – এটাই ছিল হাদির সবচেয়ে বড় অবদান। সংগঠনটির লক্ষ্য? আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, স্বাধীনতা রক্ষা করা আর একটা ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। হাদি এখানে মুখপাত্র হিসেবে জুলাই শহিদদের অধিকার, অপরাধীদের বিচার আর চার্টার ঘোষণার দাবি তুলে ধরেন। মজার ব্যাপার, এই মঞ্চ যেন একটা 'রিবুট' বাটন – পুরনো রাজনীতিকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা। ওসমান হাদি না থেকেও বেশি করে থাকবেন বাংলাদেশের বুকে, কারণ এই মঞ্চের আদর্শগুলো এখনও অনেকের মনে জ্বলজ্বল করছে।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ এবং অন্যান্য লড়াই
২০২৫ সালে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে ইনকিলাব মঞ্চের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। হাদি দাবি করেন, দলের দমনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য এটা দরকার। সরকার যখন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, তিনি প্রস্তাব করেন ট্রাইব্যুনাল আর কমিশন গঠন – যেন একটা ফেয়ার গেম। বিএনপির 'পুরনো ধারা' নিয়ে তাঁর সমালোচনা ছিল হাস্যকর কিন্তু সত্যি: "দুই বছরও টিকবেন না!" অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমালোচনায় তিনি জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দেন, যা দেখিয়ে দেয় তাঁর দূরদর্শিতা।
নির্বাচনী অভিযান: চা-সিঙ্গারা থেকে মুড়ি-বাতাসা
ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে হাদি সবাইকে চমকে দেন। প্রচারণায় চা-আড্ডা, মুড়ি-বাতাসা বিতরণ আর পকেটে টাকা ঢোকানোর ভিডিয়ো – এগুলো যেন একটা ভাইরাল ক্যাম্পেইন। লিফলেট বিতরণ থেকে ফান্ড কালেকশন, সবকিছু সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার – হাদি রাজনীতিকে 'কুল' করে তুলেছিলেন। এই ভিন্নধর্মী স্টাইল দেখে মনে হয়, রাজনীতি যেন একটা পার্টি, আর হাদি ছিলেন হোস্ট।
সৃষ্টিকর্ম এবং বিতর্ক: কবিতা থেকে গালি পর্যন্ত
হাদি শুধু রাজনীতিক নন, কবিও। 'লাভায় লালশাক পুবের আকাশ' বইটা প্রকাশ করেন সীমান্ত শরিফ ছদ্মনামে – যেন একটা লুকানো ট্যালেন্ট। কিন্তু বিতর্কও কম ছিল না। গোপালগঞ্জ ভাঙার আহ্বানে গালিগালাজ – পরে তিনি সেটাকে 'মুক্তির মহাকাব্য' বলে দুঃখ প্রকাশ করেন। হাস্যকর, কিন্তু এটা দেখায় তাঁর মানুষী দুর্বলতা।
ব্যক্তিগত জীবন এবং শেষ অধ্যায়
বিবাহিত হাদির এক সন্তান ছিল – একটা সাধারণ জীবনের ছোঁয়া। কিন্তু ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। হুমকি পেয়েও থামেননি। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসায় ১৮ ডিসেম্বর মারা যান। সরকার শোক ঘোষণা করে, কিন্তু তাঁর গল্প শেষ হয়নি। ওসমান হাদি না থেকেও বেশি করে থাকবেন বাংলাদেশের বুকে – তাঁর আদর্শ, হাসি আর লড়াইয়ের মাধ্যমে।
ওসমান হাদির জীবন আমাদের শেখায়, রাজনীতি শুধু ক্ষমতা নয়, এটা মানুষের সাথে সংযোগ। তাঁর মতো মানুষরা চলে গেলেও, তাঁদের ছাপ থেকে যায় – আর সেটাই সত্যিকারের বিপ্লব।
