সম্প্রতি ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা যেন রকেটের গতিতে উড়ছে, আর মৃত্যুর খবর শুনলে মনে হয়, মশারা যেন আমাদের সাথে কোনো ব্যক্তিগত লড়াই শুরু করেছে! আমি, একজন মশা গবেষক হিসেবে, এই দুর্যোগের মাঝে পেশাগত দায়িত্ব থেকে কলম ধরেছি। জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় আমার গবেষণা ছিল এডিস মশার বংশবৃদ্ধি, জীববিজ্ঞান এবং পরিবেশগত আচরণ নিয়ে।
এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস – এই দুই 'ভিলেন' প্রজাতির সাথে আমি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে কীভাবে তাপমাত্রা এবং খাদ্য তাদের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে, সেটা নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা করেছি। এমনকি, মশাদের একাধিকবার রক্ত খাওয়ার অভ্যাস (যাকে বলে মাল্টিপল ব্লাড ফিডিং) এবং নতুন শিকার খোঁজার প্রবণতা নিয়েও গভীর গবেষণা।
ডেঙ্গু মশা কামড়ালে করণীয়: মশার সাথে যুদ্ধে জিততে হলে জানুন এই টিপস
হ্যাঁ, এই পরীক্ষার জন্য আমাকে নিজের হাতে মশাদের 'ডিনার' সার্ভ করতে হয়েছে – কিন্তু চিন্তা নেই, সেগুলো ছিল সংক্রমণমুক্ত ল্যাব-উত্পাদিত মশা! আমার সুপারভাইজার প্রফেসর ড. নোবোকো সুনোর সাথে মিলে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই 'মশা-ফিডিং সেশন' চালিয়েছি। মজার ব্যাপার, এতে করে আমরা বুঝেছি মশারা কতটা 'পিকি ইটার' – রক্ত খেয়ে শেষ করার পরও কখনো কখনো নতুন 'মেনু' খুঁজে বেড়ায়!
ডেঙ্গুর এই মহামারী: কেন এতটা ভয়ানক?
১৯৯৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের উপস্থিতি জানা গেলেও, এবছর রোগীর সংখ্যা রেকর্ড ভাঙছে। কারণ? এবার বৃষ্টি একটু আগেই শুরু হয়েছে, যা এডিস মশাদের 'পার্টি টাইম' করে দিয়েছে। এডিস ইজিপ্টি (প্রধান বাহক, যাকে বলা যায় 'শহুরে মশা') এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস (দ্বিতীয় বাহক, 'গ্রামীণ টাইগার মশা') – এরা দুজনেই ডেঙ্গু ছড়ানোর মাস্টার। ইজিপ্টি মশা ঘরের ভেতরে, ফুলের টবে, জমানো পানির পাত্রে বা পরিত্যক্ত টায়ারে বংশবৃদ্ধি করে – যেন আমাদেরই তৈরি 'লাক্সারি হোটেল' ব্যবহার করছে! অন্যদিকে অ্যালবোপিক্টাস গ্রামে বা প্রকৃতির গর্তে, কাটা বাঁশে বা স্বচ্ছ পানিতে থাকে। কিন্তু উষ্ণতার কারণে এরা এখন একে অপরের টেরিটরিতে ঢুকে পড়ছে – যেন মশাদের মধ্যে 'টার্ফ ওয়ার' চলছে!
মজার কথা, এডিস মশা সরাসরি পানিতে ডিম পাড়ে না; তারা পানির গায়ের ভেজা অংশ বা ভাসমান পাতায় ডিম রাখে। এই ডিমগুলো শুকনো অবস্থায় ৬-৯ মাস (এমনকি ৫ বছর পর্যন্ত!) বেঁচে থাকতে পারে – যেন কোনো সায়েন্স ফিকশন মুভির ভিলেন! পরে বৃষ্টির পানিতে ফুটে লার্ভা বেরোয়, এবং স্বচ্ছ পানিতে বড় হয়। এবছর ফেব্রুয়ারির অসময়ের বৃষ্টির কারণে মশারা আগেই 'জন্মদিন' সেলিব্রেট করেছে, ফলে ডেঙ্গু আগেই হানা দিয়েছে।
মশার জীবনচক্র: ছোট্ট শত্রুর বড় গল্প
এডিস মশার লার্ভা নোংরা পানিতে বাঁচতে পারে না – সেখানে মেটাবোলাইটস জমে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যায়। ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তারা মাত্র ৭-১০ দিনে পূর্ণবয়স্ক হয়ে যায়। তাপমাত্রা বাড়লে বৃদ্ধি ত্বরান্বিত, কিন্তু ৩৫ ডিগ্রির ওপরে মৃত্যুর হার বাড়ে। কম তাপে বড় মশা, বেশি তাপে ছোট – আর এই ছোটরা তো রক্তের জন্য একাধিকবার কামড়ায়, যেন 'স্ন্যাক টাইম' ছাড়া চলবেই না! পুরুষ মশা রক্ত খায় না, তারা ফুল-ফলের রসে সন্তুষ্ট। স্ত্রী মশা ডিমের জন্য রক্ত চায়, আর তারা দিনের বেলায় সক্রিয় – সূর্যোদয়ের পর এবং সূর্যাস্তের আগে। রাতে উজ্জ্বল আলো থাকলে তারাও 'নাইট শিফট' করে!
মশার বংশবিস্তার রোধের উপায়: সহজ কিন্তু কার্যকর কৌশল
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি হলো মশার বংশবিস্তার রোধ করা। এখানে সমন্বিত পদ্ধতি দরকার: প্রজনন স্থান ধ্বংস এবং বয়স্ক মশা নিধন। মশার বংশবিস্তার রোধের উপায়গুলো এমন সহজ যে, মনে হবে যেন মশাদের সাথে 'হাইড অ্যান্ড সিক' খেলছেন:
প্রজনন স্থানের ধ্বংস:** বাড়িতে জমানো পানির পাত্র, ফুলের টব, কৌটা বা টায়ার – এগুলো ২-৩ দিন পর পর পরিষ্কার করুন। মশারা এখানে 'ফ্যামিলি প্ল্যানিং' করে, তাই এদের 'হোম ব্রেক' করে দিন! লার্ভানাশক ব্যবহার করলে আরও ভালো।
বয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ:** রাস্তায় ফগিং যথেষ্ট নয়, কারণ এডিস মশা ঘরের ভেতরে লুকোয়। ঘরে স্প্রে করুন, যেন তারা 'হাউজ অ্যারেস্ট' থেকে বাঁচতে না পারে। ব্যক্তিগত সুরক্ষায় মশারি, কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার করুন। দিনে ঘুমালে মশারি টানান – মশারা তো 'লাঞ্চ ব্রেক' নেয় না!
দুর্যোগের সময় বিশেষ ফোর্সের সাহায্য নেওয়া যায়, যেন মশা নিয়ন্ত্রণ একটা 'মিলিটারি অপারেশন' হয়ে যায়!
অ্যাডভান্সড টেকনিক: বিজ্ঞানের ম্যাজিক
বিভিন্ন দেশে মশার বংশবিস্তার রোধের উপায় হিসেবে বায়োলজিক্যাল পদ্ধতি চালু আছে। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড পুরুষ মশা – যাদের শুক্রাণুতে প্রাণঘাতী জিন – প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলে, তাদের সন্তানরা বেশিদিন বাঁচে না। কিন্তু এটা ব্যয়বহুল, কারণ ক্রমাগত ছাড়তে হয় – যেন মশাদের 'ডেটিং অ্যাপ' স্প্যাম করা!
আরেকটা সফল পদ্ধতি: উলবাচিয়া ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া মশার শরীরে ঢোকালে, তারা ডেঙ্গু ভাইরাসকে বাড়তে দেয় না। অস্ট্রেলিয়ায় এটা সাকসেসফুল – আমাদের দেশেও চেষ্টা করা যায়, যেন মশাদের 'ইমিউনিটি বুস্টার' দিয়ে তাদেরই বিরুদ্ধে লড়াই করানো!
শেষ কথা: একসাথে লড়াই করুন
সামনের কোরবানির ঈদে ঢাকা থেকে লোকজন দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাবে, যা ডেঙ্গু ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াবে। মশার বংশবিস্তার রোধের উপায়গুলো ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় স্তরে প্রয়োগ করুন। আক্রান্ত রোগীকে মশা থেকে রক্ষা করুন, কারণ তারাই ভাইরাসের উৎস। ন্যাশনাল গাইডলাইন তৈরি করে, বিদেশি টেকনোলজি আমদানি করুন। বিচলিত না হয়ে, সবাই মিলে কাজ করলে এই 'মশা-যুদ্ধ' জিততে পারব – আর মশারা শেষমেশ 'সারেন্ডার' করবে!
(লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, প্যারাসাইটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ)
