কল্পনা করুন, আপনি যদি পায়ে হেঁটে পুরো পৃথিবী একবার চক্কর দিতে চান। কত সময় লাগবে? যদি দিনরাত না ঘুমিয়ে, না খেয়ে একটানা হাঁটেন, তাহলেও লেগে যাবে প্রায় দু'বছর! আর স্বাভাবিকভাবে খাওয়াদাওয়া, ঘুমিয়ে – তাহলে তো আরও বেশি। জুল ভার্নের বিখ্যাত উপন্যাস আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ-এ নায়ক ফিলিয়াস ফগ ট্রেন-জাহাজে চেপে ৮০ দিনে করে ফেলেছিলেন। আজকাল সুপারসনিক জেটে মাত্র ৩২ ঘণ্টা। কিন্তু পৃথিবীটা আসলে কত বড় যে এত সময় লাগে?
আধুনিক পরিমাপ অনুযায়ী, পৃথিবীর পরিধি নিরক্ষরেখা বরাবর প্রায় ৪০,০৭৫ কিলোমিটার। মেরু বরাবর একটু কম, প্রায় ৪০,০০৮ কিলোমিটার। গোলাকার না হলে তো এত হিসাবের দরকারই পড়ত না!
পৃথিবীর পরিধি কত কিলোমিটার?
আমরা তো ছোটবেলা থেকেই জানি পৃথিবী গোল। কিন্তু প্রাচীনকালে মানুষ ভাবত সমতল। চারদিকে তাকালে তো সমতলই মনে হয়! যেমন একটা বিশাল ভলিবলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলে তার পৃষ্ঠ সমতল লাগবে। আজও কিছু মানুষ 'ফ্ল্যাট আর্থ' বিশ্বাস করেন – তাঁদের জন্য বলি, পৃথিবীতে বসেই প্রমাণ করা যায় এটা গোল। কিন্তু সবচেয়ে মজার প্রমাণ এসেছে প্রায় ২,২০০ বছর আগে, একজন গ্রিক পণ্ডিতের কাছ থেকে।
তাঁর নাম ইরাটোস্থিনিস। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির প্রধান। একদিন শুনলেন, মিসরের আসওয়ান (তখনকার সাইনি) শহরে গ্রীষ্মের অয়নকালে (২১ জুন) ঠিক দুপুরে একটা গভীর কূপের তলায় সূর্যের আলো সোজা পড়ে – কোনো ছায়া পড়ে না। অর্থাৎ সূর্য ঠিক মাথার ওপর।
ইরাটোস্থিনিস ভাবলেন, যদি পৃথিবী সমতল হয়, তাহলে সব জায়গায় একই সময়ে এটা হওয়ার কথা। কিন্তু তাঁর শহর আলেকজান্দ্রিয়ায় সেই দিন দুপুরে একটা খাড়া লাঠি (গনোমন) পুঁতে দেখলেন, ছায়া পড়ছে! ছায়া আর লাঠির মধ্যে কোণ হয়েছে প্রায় ৭.২ ডিগ্রি।
এখান থেকে জাদু শুরু। তিনি জানতেন দুই শহরের দূরত্ব প্রায় ৫,০০০ স্টেডিয়া (প্রাচীন গ্রিক একক)। এই ৭.২ ডিগ্রি হলো পূর্ণ বৃত্তের (৩৬০ ডিগ্রি) ঠিক ৫০ ভাগের এক ভাগ (৩৬০ ÷ ৭.২ = ৫০)। তাই পুরো পরিধি হবে দূরত্ব × ৫০ = ২,৫০,০০০ স্টেডিয়া।
স্টেডিয়ার মান নিয়ে একটু বিতর্ক আছে, কিন্তু তাঁর হিসাব আধুনিক মানের সঙ্গে অবিশ্বাস্যভাবে কাছাকাছি – মাত্র ১-২% ভুল! অথচ শুধু একটা লাঠি, ছায়া আর একটু গণিত দিয়ে। ইউরেকা মোমেন্টের সেরা উদাহরণ!
আরেকটা মজার হিসাব: গড়ে একজন মানুষ হাত প্রসারিত করলে প্রস্থ প্রায় ১.৮৪ মিটার। বর্তমানে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮০০ কোটির কাছাকাছি। সবাই পাশাপাশি দাঁড়ালে পৃথিবীকে প্রায় ৪০০ বারের বেশি চক্কর দেওয়া যাবে। দেখুন তো, আমরা কত ছোট, আর পৃথিবী কত বিশাল!
অবশ্য বৃহস্পতির তুলনায় পৃথিবী খেলনা। সৌরজগতে বৃহস্পতির ভিতর ১,০০০টা পৃথিবী ঢোকানো যায়। কিন্তু এই ছোট্ট নীল গ্রহটাই আমাদের একমাত্র ঘর। ইরাটোস্থিনিসের মতো কৌতূহলী মনই আমাদের এতদূর এনেছে। পরের বার সূর্যের ছায়া দেখলে একটু ভেবে দেখবেন – একটা সাধারণ লাঠি কীভাবে পুরো গ্রহের সাইজ মেপে ফেলেছিল!