আমরা ইন্টারনেটের জন্য টাকা দিই কেন? আসলে তারা কী বিক্রি করছে?

আমরা ইন্টারনেটের জন্য টাকা দিই কেন



ইন্টারনেট হলো বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে থাকা অসংখ্য কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইসের একটি বিশাল সংযোগব্যবস্থা। যখন একাধিক কম্পিউটার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। এ ধরনের লক্ষ লক্ষ নেটওয়ার্ক একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গঠন করেছে, সেটিই ইন্টারনেট।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিভাইস ইন্টারনেট প্রোটোকল (IP) নামক নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে তথ্য আদান-প্রদান করে। এর ফলে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খুব দ্রুত তথ্য পাঠানো ও গ্রহণ করা সম্ভব হয়।

সহজভাবে বললে, ইন্টারনেটে সংযুক্ত একটি কম্পিউটার বা মোবাইল ডিভাইস আইপি (IP) নামক নিয়ম অনুসরণ করে নেটওয়ার্কে থাকা অন্যান্য ডিভাইসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে এবং তাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হয়।

আমরা ইন্টারনেটের জন্য টাকা দিই কেন?

সহজভাবে বললে, আমরা ইন্টারনেটের জন্য টাকা দিই কারণ ইন্টারনেট সংযোগ চালু রাখতে অনেক ধরনের অবকাঠামো (infrastructure) ও সেবা পরিচালনা করতে হয়।

যখন আপনি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তখন আপনার ডিভাইস থেকে তথ্য বিভিন্ন তার, অপটিক্যাল ফাইবার, মোবাইল টাওয়ার, রাউটার, সুইচ এবং সার্ভারের মাধ্যমে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। এসব যন্ত্রপাতি স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পরিচালনার জন্য খরচ হয়।

তাই Internet Service Provider (ISP) বা মোবাইল অপারেটররা এই সেবা দেওয়ার বিনিময়ে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে টাকা নেয়।

    একটি সহজ উদাহরণ:


  • রাস্তা ব্যবহার করে যেমন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া যায়, তেমনি ইন্টারনেট অবকাঠামো ব্যবহার করে তথ্য এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে যায়।
  • রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে যেমন খরচ হয়, তেমনি ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক তৈরি ও পরিচালনাতেও খরচ হয়।
  • সেই খরচ মেটানোর জন্যই ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেট বিল দিতে হয়।

ISP (Internet Service Provider)

ISP (Internet Service Provider) আপনার কাছ থেকে যে টাকা পায়, তার একটি অংশ তারা বিভিন্ন জায়গায় ব্যয় করে। যেমন—

  1. ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ কিনতে — ISP-গুলো বড় বড় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক অপারেটরদের কাছ থেকে ইন্টারনেট সংযোগ বা ব্যান্ডউইথ কিনে।
  2. নেটওয়ার্ক অবকাঠামো পরিচালনা করতে — ফাইবার অপটিক কেবল, রাউটার, সুইচ, ডেটা সেন্টার, টাওয়ার ইত্যাদি স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য।
  3. বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে — সার্ভার ও নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি চালু রাখতে প্রচুর বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খরচ হয়।
  4. কর্মচারীদের বেতন দিতে — প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান, কাস্টমার সাপোর্টসহ বিভিন্ন কর্মীর বেতন দিতে হয়।
  5. সরকারি ফি ও কর দিতে — লাইসেন্স ফি, কর এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক খরচ পরিশোধ করতে হয়।

সহজভাবে বললে, আপনার ISP নিজে পুরো ইন্টারনেটের মালিক নয়। তারা আরও বড় নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যাকবোনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে এবং সেই সংযোগের জন্য টাকা দেয়। এরপর তারা সেই ইন্টারনেট সংযোগ আপনাকে সেবা হিসেবে প্রদান করে।


আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক অপারেটররাও সবার কাছ থেকে বিনামূল্যে ইন্টারনেট পায় না। তারা সাধারণত আরও বড় নেটওয়ার্কের সঙ্গে ট্রানজিট (transit) বা পিয়ারিং (peering) চুক্তি করে।

সহজভাবে স্তরগুলো এভাবে কল্পনা করতে পারেন:

  • আপনি টাকা দেন আপনার ISP-কে।
  • ISP টাকা দেয় বড় জাতীয় বা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক অপারেটরকে।
  • ছোট আন্তর্জাতিক অপারেটররা আরও বড় বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের কাছে ট্রানজিট কিনে।
  • সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ব্যাকবোন নেটওয়ার্কগুলো প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে পিয়ারিং করে, যেখানে উভয় পক্ষ নিজেদের গ্রাহকদের ট্রাফিক বিনিময় করে।

ইন্টারনেটের কোনো একক মালিক নেই। এটি হাজার হাজার কোম্পানি, সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত। প্রত্যেকে নিজেদের নেটওয়ার্ক নির্মাণ ও পরিচালনার খরচ বহন করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগের জন্য অর্থ প্রদান করে।

উদাহরণস্বরূপ, বড় নেটওয়ার্ক অপারেটরদের মধ্যে Lumen Technologies, NTT, এবং Arelion-এর মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরা নিজেদের বৈশ্বিক ফাইবার নেটওয়ার্ক তৈরি ও পরিচালনা করে এবং অন্যান্য নেটওয়ার্ককে সংযোগ সেবা বিক্রি করে।

অর্থাৎ, ইন্টারনেটে টাকা প্রবাহ সাধারণত নিচ থেকে ওপরে যায়—ব্যবহারকারী → ISP → বড় নেটওয়ার্ক → আরও বড় নেটওয়ার্ক। তবে সবচেয়ে বড় স্তরে অনেক সময় নেটওয়ার্কগুলো পারস্পরিক সুবিধার জন্য সরাসরি সংযুক্ত থাকে, যেখানে আলাদা অর্থ লেনদেন নাও হতে পারে।

আসলে তারা কী বিক্রি করছে?

আসলে তারা "ইন্টারনেট" নামের কোনো বস্তু বিক্রি করছে না। তারা বিক্রি করছে সংযোগ (connectivity) এবং ডেটা পরিবহনের ক্ষমতা

ধরুন, আপনি ঢাকায় বসে একটি ভিডিও দেখতে চান। সেই ভিডিওটি হয়তো আমেরিকার কোনো সার্ভারে আছে। আপনার অনুরোধ (request) এবং ভিডিওর ডেটা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আপনার কাছে আসে। এই যাত্রাপথে অসংখ্য ফাইবার অপটিক কেবল, রাউটার, সুইচ এবং নেটওয়ার্ক ব্যবহার হয়।

নেটওয়ার্ক অপারেটররা মূলত বলছে:

"আমাদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তোমার ডেটা পৃথিবীর অন্য নেটওয়ার্কে পৌঁছে দিতে পারি। এর জন্য আমাদের টাকা দাও।"

একটি উদাহরণ:

  • বিদ্যুৎ কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করে।
  • রাস্তা কর্তৃপক্ষ রাস্তা তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করে।
  • ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক অপারেটররা ডেটা বহনের "রাস্তা" তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করে।

তারা বিক্রি করছে:

  • ব্যান্ডউইথ (একসঙ্গে কত ডেটা বহন করা যাবে)
  • নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার
  • ডেটা পরিবহন
  • নির্ভরযোগ্যতা ও গতি

অর্থাৎ, আপনি যখন ISP-কে টাকা দেন, তখন আসলে আপনি টাকা দিচ্ছেন আপনার ডেটাকে বিশ্বের অন্যান্য কম্পিউটার ও সার্ভারে পৌঁছে দেওয়ার সেবার জন্য। ইন্টারনেটকে একটি বিশাল সড়কব্যবস্থা মনে করলে, তারা রাস্তা নয়, বরং সেই রাস্তা ব্যবহার করার অধিকার ও পরিবহন সেবা বিক্রি করছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post